লুৎফর রহমান রিটন
১২ হেয়ার স্ট্রিটের সঙ্গে আমার এক জীবনের সম্পর্কের শেষ সূতোটা ছিঁড়ে গেলো কিছুক্ষণ আগে। অবশেষে দীর্ঘ অসহনীয় কষ্টকর জীবন থেকে মুক্তি ঘটলো আম্মার। টানা কুড়ি বছরের হুইল চেয়ারের জীবন এবং শেষ পাঁচ বছরের নির্বাক জীবনটা ভয়ংকর দুর্বিষহ ছিলো তাঁর। দেয়াল কিংবা ছাদের দিকে তাকিয়ে নড়াচড়ায় অক্ষম শরীরটা নিয়ে বিছানায় শয্যাশায়ী থাকতে থাকতে বেড শোর হয়ে গিয়েছিলো। সেই বেড শোর জনিত ক্ষতে দলবেঁধে কামড়াতো পিঁপড়েরা। হাত দিয়ে একটা পিঁপড়ে সরানোর ক্ষমতাও ছিলো না আম্মার।
মৃত্যুর আগের দিন রাতে আম্মার সঙ্গে আমার শেষ দেখাটা হয়েছিলো বড় বোনের ভাইবার ভিডিও কলের মাধ্যমে। হাসপাতাল কেবিনে অক্সিজেন মাস্ক পরা আম্মা নিঃশ্বাস নিতে পারছিলেন না। নিঃশ্বাস না নিতে পারার যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন তিনি। সেই দৃশ্য সহ্য করা কঠিন। কয়েক সেকেন্ড দেখার পরেই আমি ভিডিও কানেকশনটা অফ করে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম–এই জীবন থেকে আম্মার মুক্তি দরকার। আর কতো! কুড়ি বছর কোনো কম সময় তো নয়! একমাত্র মৃত্যুই তাঁকে দিতে পারে মুক্তি।
অবশেষে মুক্তি পেলেন তিনি।
অবসান হলো ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের।
সংসার থেকে বিতাড়িত হওয়া আমার সঙ্গে আম্মার যোগাযোগটা রক্ষিত হতো বরাবরই বড় ভাইয়ের মাধ্যমে। বছরের পর বছর বড় ভাইয়ের মাধ্যমেই আম্মার সঙ্গে আমার কথা হতো। দেখা হতো ভিডিও কলে। এমনকি আম্মার বাকশক্তি রহিত হবার পরেও মানচিত্রের বিপরীত পিঠে থাকা আমি বারবার বহুবার নিয়মিত আম্মাকে দেখেছি বড় ভাইয়ের কল্যাণে। শেষ অনেকগুলো বছর তিনি কথা বলতেন না। কাউকে চিনতেন না। এমন কি বড় ভাইকেও না।
আম্মার নাড়ি ছিঁড়েই পৃথিবীতে এসেছিলাম আমি। আমার রিটন নামটাও তাঁরই দেয়া। লিটন নয়, রিটন রেখেছিলেন তিনি। আমার জন্মের সময়ও দেশে অজস্র লিটন ছিলো, কিন্তু রিটন ছিলো একটাই!
২
আমার ষ্পষ্ট মনে আছে ২০০১ সালে স্ট্রোক-এ আক্রান্ত হয়ে শমরিতা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আম্মার কেবিনের শয্যার পাশে বসে স্যালাইন পুশ করা তাঁর হাতের ওপর আলতো করে আমার হাতটা রেখে আমি বলেছিলাম–”আম্মা এমনিতেই আমি আপনার কাছ থেকে দূরে আছি। ভবিষ্যতে হয়তো আরো দূরে চলে যাবো। এতো দূরে যে আপনার সঙ্গে আমার আর দেখাই হবে না! তখন আপনি কী করবেন? আমাকে বদ দোয়া দেবেন? অভিশাপ দেবেন?
আমার প্রশ্নে কী রকম আঁতকে উঠেছিলেন নাকে নল লাগানো আম্মা–এইটা কী বললা তুমি বাজান? তোমার উপরে আমরা অন্যায় করে ফেলছি। তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিসি। তুমিতো কোনো অপরাধ করো নাই! তোমাকে কেনো অভিশাপ দিবো? তুমি যেইখানেই যাও, যতো দূরেই যাও, জানবা আমার দোয়া তোমার সঙ্গে থাকবে। মায়ের আশীর্বাদ তোমার সঙ্গে থাকবে…খোদার কাছে তোমারে সাফায়াত কইরা দিছি বাজান…বলতে বলতে আমার মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলো কাঁপা কাঁপা হাতে এলোমেলো করে দিয়েছিলেন আম্মা। আমি বলেছিলাম—আমাকে ওরা আপনার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত করেছে। সম্পত্তিও ওরা কেড়ে নিতে পারবে কিন্তু মায়ের দোয়া আর আশীর্বাদ কোনোদিন কেড়ে নিতে পারবে না।
মায়ের সঙ্গে আমার সেই কথোপকথনের স্মৃতি আজও আমাকে সাহস যোগায়। শক্তি যোগায়। পরবর্তীতে দেশে বিদেশে কতো রকমের সংকটেই না পড়েছি কিন্তু মায়ের অদৃশ্য আশীর্বাদ সব সময় আমাকে উদ্ধার পেতে সাহায্য করেছে। চোখ বন্ধ করে হাসপাতালের সেই দুপুরের স্মৃতিময় ছবিটা যখনই স্মরণ করি মায়ের গায়ের গন্ধের সঙ্গে হাসপাতালের ফিনাইলের একটা গন্ধ কী রকম মাখামাখি হয়ে আমার নাকের কাছে ঘুরতে থাকে। আমি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিই—আম্মা!”
৩
আমার জীবনের একমাত্র অভিমান আর কান্নার অনুষঙ্গটির পরিসমাপ্তি ঘটলো আজ।
অটোয়ার পার্কে ম্যাপল কিংবা ওক গাছের নিচের বেঞ্চিতে বসা নিঃসঙ্গ আমি আর কাঁদবো না মায়ের সঙ্গে বিচ্ছেদের বেদনায়।
অটোয়া রিভারের তীরে পাথরের ওপর বসে থাকা আমার পায়ের ওপর আছড়ে পড়া ঢেউ এসে আমাকে আর বলবে না–তুমি আর কেঁদো না তো, তোমার কোনো ভয় নেই, মায়ের দোয়া সঙ্গে আছে……
অটোয়া ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০