সর্বশেষ লেখাসমূহ:
এক জীবনের গল্প (পর্ব-১)

এক জীবনের গল্প (পর্ব-১)

Print Friendly, PDF & Email

আমিনুল ইসলাম মামুন

জীবনের জীবনাচরণ এমনই; সমসাময়িকদের তুলনায় ভিন্ন ধাঁচের। শৈশবের দেয়াল ডিঙিয়ে যখন সে পদার্পণ করল কৈশোরে, তখন কারো বুঝতে অবশিষ্ট রইল না যে সে তার পিতার একজন যোগ্য উত্তরসুরি। কী কথাবার্তায়, কী শিষ্টাচারে, কী নিয়মানুবর্তীতায় সর্ব ক্ষেত্রেই তার পিতার বৈশিষ্ট্যের ছাপ। কিন্তুু কৈশোরের আঙিনা থেকে বিদায় নিয়ে যৌবনের উত্তাল সমুদ্রে যে সে ‘উত্তরসুরি’ সীমারেখাটি অতিক্রম করবে এ কথা ভাববার সুযোগ কারো ছোট্ট মনের আশপাশের কোথাও স্থান করে নিতে সক্ষম হয়নি।
দেহের গড়নটা বেশ চমৎকার জীবনের। চওড়া কপাল। তার সাথে সাযুজ্যের বিন্দুমাত্র অভাব ঘটেনি মুখাবয়বের অবশিষ্টাংশের। চোখ দু’টি শান্ত কিন্তু অনুসন্ধিৎসু। তার বাচনভঙ্গী অনেকের কাছেই ঈর্ষণীয়। সংস্কৃতিমনা ও প্রবল বিদ্যাগ্রহের ফলেই এ গুণটি তার রপ্ত হয়েছে। কবিতা আবৃত্তি তার শখের মধ্যে প্রথম স্থানে। বাসায় তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটাও বেশ সমৃদ্ধ। পিতা ধর্মপ্রাণ মানুষ। সেই সুবাদে পাওয়া বেশ কিছু ধর্মীয় পুস্তক দিয়েই তার লাইব্রেরিটার জন্ম। এরপর যুক্ত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের অনেক পুরোনো গ্রন্থ থেকে শুরু করে রবীন্দ্র-নজরুল যুগের লেখকদের বই এবং রাহমান-মাহমুদ যুগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের নামজাদা সব লেখকের গ্রন্থ; রয়েছে ইংরেজী সাহিত্যের বহু গ্রন্থও। তার নিজ ধর্মীয় গ্রন্থের পাশাপাশি বাইবেল, বেদ প্রভৃতিও মিতালী গড়েছে। প্রথম প্রথম পিতা এ বিষয়ে ভ্রু সংকোচন করলেও যখন বুঝতে পারলেন জ্ঞানাগ্রহ তার সন্তানকে তাড়া করে ক্লান্ত করছে আর সেই ক্লান্তি দূর করতেই জীবনের এ প্রচেষ্টা, তখন তার ভ্রু’র প্রসারণ ঘটে যথাস্থানে প্রতিস্থাপিত হল। আড্ডায় তার ঝোঁক নেই। তবে একেবারেই যে শূন্যের খাতায় তা-ও নয়; খুবই কম। গত সপ্তাহে কয়েক বন্ধুসহ বেশ ক’ দিন পর আড্ডায় বসেছিল জীবন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা। সে ব্যক্তি বিশেষের সমালোচনা শ্রবণ করেছিল; অংশ নেয়নি, অংশ নিয়েছিল আলোচনায়। তবে যে ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষের আসন শূন্য কিংবা থাকলেও নগণ্য সে ক্ষেত্রে তার ভূমিকা আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনাতেও গড়াতে পারে। বাংলা সাহিত্যে শব্দ চয়ন প্রসঙ্গে বন্ধুদের সবার মতামত এক হলেও তার মতামত ভিন্ন। ‘সাহিত্যকে মানের সিঁড়িতে ওপরে নিতে হলে সাহিত্যে পুরনো শব্দকে ছেঁটে নতুন নতুন শব্দ চয়ন আবশ্যক’- এক বন্ধুর এ কথা তার কাছে পুরোপুরি সন্তোষজনক মনে হলো না। তার মতামত হলো ‘সাহিত্যকে মানের সিঁড়িতে এগিয়ে নিতে হলে সাহিত্যে নতুন নতুন শব্দের প্রয়োগ যেমন অত্যাবশ্যক, এর পাশাপাশি তেমনি অত্যাবশ্যক পুরাতন শব্দগুলোকেও বাঁচিয়ে রাখা। তা না হলে এক সময় এ শব্দগুলো ভাষার ভুবন থেকে হারিয়ে যাবে। বিশ্বে এমন অনেক ভাষা ছিল যেগুলোর অস্তিত্ব আজ নেই। ভাষাকে যদি কোন স্বাভাবিক বস্তুর সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে উক্ত ভাষার একেকটি শব্দ ও অক্ষরকে অণু-পরমাণুর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। সেই বস্তুই যদি হারিয়ে যেতে পারে, তাহলে বস্তুর ভগ্নাংশ অণু-পরমাণু হারাতে কতক্ষণ। বাবা-মা তাদের সবল-সুন্দর সন্তানটিকে যেমন স্নেহে কাছে টানেন, তেমনি স্নেহে কাছে টানেন অতিশয় দূর্বল, কৃষ্ণবর্ণের সন্তানটিকেও। তা না হলে ‘সভ্যতা’ শব্দের অর্থ হতো ভিন্ন। ভুলে গেলে চলবে না পুরনো বা প্রাচীন শব্দ বলে যাদের ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে, তাদের দিয়েই সূচনা হয়েছে ভাষার কিংবা ভাষার আজকের অবস্থান।
সমসাময়িকদের অনেকে আমাদের সংস্কৃতিতে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুপ্রবেশকে ‘আধুনিকতার ছোঁয়া’ বললেও জীবনের মতে, এ আধুনিকতাতো নয়ই; বরং আমরা যেটাকে আদিম বলে জানি, তার চেয়েও আদিম। যে সংস্কৃতি নারীর বস্ত্র হরণ করছে, দেহের নগ্নাংশকে অসভ্যতার অধর স্পর্শের জন্য উন্মুক্ত করে দিচ্ছে আর পুরুষদের করছে বিপথগামী, সে সংস্কৃতি আধুনিক হওয়ার কোন যুক্তি সঙ্গত কারণ নেই। ‘অতি আদিম’ এই অর্থে যে, আদিম কালে মানুষ দেহের নগ্নাংশকে স্বল্প পরিধেয় সামগ্রীর মাধ্যমে ঢেকে রাখতো বা রাখার চেষ্টা করতো পরিধেয় সামগ্রীর অভাবে; নিজেদের অনিচ্ছায়। আর এখন রাখছে স্বেচ্ছায়। নিজের সাথে অন্যদের পার্থক্যকে জীবন এটা মনে করে না যে, এই পার্থক্য অন্যদের সাথে তার মেলা-মেশায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বরং সে সকলের সাথে মিশতে পারে অন্য দশ জনের মতো; কখনো কখনো তার চেয়ে কিছুটা বেশিও বলা চলে। এ মেলা-মেশা নারী-পুরূষ সকলের সাথেই সমান। তবে এটার একটা সীমা রেখা টানা আছে তার। তার মতে, এর বাইরে পা গেলেই তা হবে দৃষ্টিকটু।
আজ থেকে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস শেষ হয়ে গেল। তাই ভার্সিটিতে যাওয়ার চিন্তা মাথায় নেই জীবনের। দেড় মাস পর ইয়ার ফাইনাল। ভালো একটা পরীক্ষা দিতে পারার চেষ্টা করছে জীবন। অনেক সময় পর্যন্ত মনটাকে চৌ-কোনা টেবিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে রাখতে এক ঘেয়েমী এসে গেল জীবনের। কলমটাকে বইয়ের ভেতর রেখে বইটা বন্ধ করল। তারপর উঠে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল। ভাবলো, ক্লান্ত মনটাকে ঘুড়ির মতো উড়িয়ে দেয়া যাক। নাটাই-সুতায় আবদ্ধ ঘুড়ির মতো নয়; সুতা কাটা ঘুড়ির ন্যায়। নাটাই-সুতায় আবদ্ধ থাকলে ঘুড়ির স্বাধীনতা কোথাও না কোথাও গিয়ে বাধা প্রাপ্ত হবে। আর সুতা কাটা ঘুড়ি বাতাসের সাথে হারিয়ে যাবে আদিগন্তে। কিন্তু ঘুড়িটা থেমে গেল তার মাধ্যমিক স্কুল জীবনের এক স্মৃতির পাথরে।
এ কাজটা জীবন প্রায়ই করে। এটা হল স্মৃতিকে শাণিত করার একটা কার্যকরী কৌশল। কোন ঘটনা বা বিষয় যতই স্মরণ রাখার যোগ্য হোক না কেন, রোমন্থনের অভাব ঘটলে তা স্ম^ৃতির পাতা থেকে কোন না কোন সময় হারিয়ে যেতে বাধ্য। এতে কারো বিন্দু মাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকার কথা নয় বলে মনে করে জীবন।
সেদিন ছিল শনিবার। টিচার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। টিফিন বিরতির সময় শুরু হল। ছেলে-মেয়েরা একে একে সবাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। যাচ্ছিল জীবনও। পেছন থেকে একটি কিশোরী কন্ঠের আহবান তাকে থামিয়ে দিল। পেছনে তাকাল সে। কিশোরীটি এগিয়ে এল। ওর নাম তাসমিনা। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সে সপ্তম। দেহের গড়নটা মোটামুটি। শান্ত দু’টি চোখ। গোল-গাল চেহারা। গায়ের রংটা ফর্সা। খুব ছোট্ট স্বরে কথা বলে সে।
: তোমার সাথে একটু কথা বলতে চেয়েছিলাম।
: ঠিক আছে। কোথায় বসা যায় তাহলে? – জীবন বলল।
: ক্লাসেই বসি- বলেই তাসমিনা বসার জন্য বেঞ্চের দিকে পা বাড়াল। সঙ্গে জীবনও। বসল দু’ জনে। একই বেঞ্চে, খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে। তাসমিনার শান্ত চোখ দুটোর দৃষ্টি পায়ের নিচের মাটির সাথে যেন মিতালী গড়েছে। কথা যেন জীবনের সাথে নয়, মাটির সাথে; গোপন কোন ভাষায়। জীবন একটু মনযোগ দিয়ে তাকাল তাসমিনার প্রতি। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে এল, যেমনটা ছিল না কিছুক্ষণ আগেও।
জীবন ডাকলো তাকে। মাথা তুলে জীবনের দিকে তাকালো তাসমিনা। জীবন বললো- কি কথা বলবে বলেছো। চুপ হয়ে আছো যে?
তাসমিনা কথা ঘোরালো। যে কথা সে জীবনকে বলবে ভেবেছিল তা বলার সাধ্য এখন তার নেই। শুধু বলল, আজ মনটা আমার একদম ভালো নেই জীবন।
: কারণটা শুনি। তাছাড়া কি কথার জন্যইবা আমাকে বসালে এখানে।
: মন ভালো নেই- এ কথাটা বলতে।
জীবন হেসে উঠলো। বলল, মন ভালো নেই, এ কথা বলতে আবার বসতে হয় নাকি। যা হোক খানিক পরেই ভালো হয়ে যাবে।
: কি করে বুঝলে?
: এটা তো বেশ সহজ হিসাব। তোমার মন ভালো নেই- এ কথা আর কাউকে না বলে যখন আমাকে বললে, তখন বুঝতে তেমন একটা সময় নিতে হয় না যে আমার সাথে কথা বললেই ঠিক হয়ে যাবে। যাক, অন্য প্রসঙ্গে আসি। বেশ কয়েক দিন ধরেই বিষয়টা তোমাকে বলবো বলে ভাবছি। কিন্তু সুযোগ হয়ে উঠে না। আজ যখন সুযোগ হয়েছে, তখন যদি অনুমতি দাও বলতে পারি।
: নিশ্চিন্তে বলতে পারো।
: আমি তোমার নামটা একটু পরিবর্তন করে দিতে চাই।
: হঠাৎ করে নাম পরিবর্তন কেন?
জীবন বলল, না এমনিতেই।
: এমনিতেই তো হতে পারে না। আমার নামটা কি তোমার পছন্দ হয় না? আমার কাছে তো সুন্দরই মনে হয়।
: আমার কাছেও তাই মনে হয়। তবে আমার কাছে আরেকটি সুন্দর নাম আছে।
: শুনি তাহলে।
: তাসমিনা নামটি আমার কাছে ডাকতে দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার বলে মনে হয়। একটু বেখাপ্পা লাগে। তাই নামটি সংস্কার করে শুধু আমার জন্য আমি একটি নাম দিতে চাই।
তাসমিনা হাসল। শিশুসুলভ হাসি। বলল, আমার কোন কিছুর ওপর কাউকে আমি কর্তৃত্ব করার সুযোগ দেইনি এবং দেবোও না; শুধু তোমার কথা ভিন্ন। এবার নামটি শুনি।
: ঘরে সবাই তোমাকে কি নামে ডাকে?
: তাসু।
: এ নামটা অবশ্য ছোট্র। মন্দ না। তবে দ্বিতীয় অক্ষরটিতে কাঁচি চালিয়ে তদস্থলে একটা নতুন অক্ষর ‘জ’ বসালে কেমন হয়।
: ‘তাজ’! অসম্ভব সুন্দর!
: একটু বেশি বলা হয়ে গেল যে।
: মোটেই না। বরং তোমার সৃষ্টিশীলতার প্রশংসা যতটুকু করা প্রয়োজন ছিল, ততটুকু প্রকাশেও আমি কার্পণ্য করেছি। আমি সারাটা জীবন ‘তাজ’ হয়ে থাকতে চাই জীবন।
তাসমিনার মুখাবয়বে একটা অব্যক্ত ভাষা প্রকাশ পায়। কানের ডগা লাল হয়ে আসে তার। সে আড়চোখে তাকায় জীবনের দিকে। এমনি সময় রুমের সামনে দিয়ে হেঁটে যায় মনির স্যার। মনির স্যার তাদের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের ক্লাস নেন। বেশ কড়া মেজাজের মানুষ তিনি। এরপর আরো কিছু সময় কথা হয় দু’ জনের।
টিফিন বিরতির পর পুনরায় ক্লাস শুরু হওয়ার ঘন্টা বাজল। মনির স্যার ক্লাসে প্রবেশ করলেন। কাউকে পড়া জিজ্ঞেস না করে শুধু জীবনকেই ধরলেন তিনি। জীবনের বুঝতে বাকি রইলো না যে পড়া পারুক আর না-ই পারুক, বেত্রাঘাত থেকে আজ তার নিস্তার নেই। কারণ কিছুক্ষণ পূর্বে তিনি জীবনকে তাসমিনার সাথে বসে থাকতে দেখেছেন। হাতে দুটো বেত। বেত দুটোকে তিনি মোছড়াতে মোছড়াতে বললেন, জীবন দাঁড়াও। সে দাঁড়াল।
: গত দু’ দিন ক্লাসে তোমার উপস্থিতি লক্ষ্য করিনি। তার কারণ অবশ্য আমি জানতে চাইবো না। পড়াও জিজ্ঞাসা নয়। তবে বেঞ্চ থেকে উঠে এসো।
পুরো ক্লাসে পিন পতন নীরবতা। অনেকে একে অপরের মুখের দিকে তাকালো। তারা ব্যাপারটা বুঝে উঠছে না। জীবন স্যারের টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো। পেছনে ব্ল্যাক বোর্ড। তিনি খুব ভারী গলায় বললেন, মেয়েদের সাথে এতো কিসের আলাপ?
জীবন চুপ থাকে। একই ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা একে অপরের সাথে প্রয়োজনে কথা-বার্তা বলতেই পারে। এটা জগতের সব মানুষ মানলেও ব্যতিক্রম শুধু মনির স্যার। তিনি কঠিন দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে এলেন জীবনের দিকে। জীবন তাজের দিকে চোখ ফেরালো। ওর মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে এলো- দেখলো জীবন। মনির স্যার ঠিক তখনি কষে একটা বেত বসালেন জীবনের পিঠে। ওর চোখ স্বাভাবিক। কিন্তু অশ্র“ টলটল করছে তাজের। আষাঢ়ে পুকুর যেমন পানিতে টলমল করে পাড়কে ছুঁই ছুঁই করে উপছে পড়ার মতো অবস্থা, ঠিক তেমন। স্যার পাষাণের মতো ওর পিঠে বেত চালাতে লাগলেন যেন কোন মহা অপরাধের দরুণ মুনিব তার দাসকে শায়েস্তা করে চলেছে।
তাজের চোখ থেকে টলটল করে অশ্র“ গড়িয়ে পড়তে লাগলো বেঞ্চের ওপর খুলে রাখা বইয়ের পাতায়। বুকের ভেতর একটা প্রচন্ড কষ্ট অনুভব হয়। নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয় তার। লজ্জায় তার মাথা হেট হয়ে আসে। মনির স্যার তার ক্রোধ ঝাড়া শেষ করলেন। কিন্তু জীবনের চোখে এক বিন্দু পানিও এলো না। আসতে চেয়েছিল। বেশ কঠোরভাবে নিজেকে সামলে রাখলো। পিঠে দাগ বসেছে, জ্বালাও করছে বেশ। তাজের দিকে তাকালো সে। তাজের চোখের পানিতে সামনে রাখা বইটির বেশ কিছু অংশ ভিজে রয়েছে। জীবনকে স্যারের ওপর প্রচন্ড ক্ষুব্দ মনে হলো। কিছুক্ষণ ওখানে দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবলো। পরেই সে টেবিলের ওপর থেকে চকটি নিয়ে ব্ল্যাক বোর্ডের সামনে দাঁড়ালো। সেখানে সে লিখলো ছোট্র একটি ছড়া-
বেত্রাঘাতে হয় না শেখা
তখন শেখা হয়
শিষ্য-গুরু সম্পর্ক
যখন ভালো রয়।
দরদ মাখা সম্পর্ক
সবার জানা চাই
ভিন্ন কিছু ভাবলে বোকা
তার মতো কেউ নাই।
ক্লাসে উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীরা সেদিন জীবনের এ কান্ড দেখে বিস্মিত হল। কেউ কেউ ভাবলো, আজ আর তার পিঠের চামড়া অবশিষ্ট থাকবে না। কিন্তু ঘটলো আসলে তার বিপরীত। স্যার চুপসে গেলেন।
সেদিন স্যার আর বেশিক্ষণ ক্লাসে থাকলেন না। এরপর থেকে মনির স্যারের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তিনি বুঝতে পারেন, এ অন্যদের মতো সাধারণ ছেলে নয়; আলাদা। হয়তো ভবিষ্যতে ও হবে একজন অসাধারণ মানুষ, যে সত্য প্রকাশে করবে না কোন দ্বিধা, অন্যায়কে করবে তীর ছুঁড়ে ক্ষত-বিক্ষত, করবে ন্যায়ের পূঁজা।
এর কিছুদিন পর।
তাজ একদিন উপস্থিত হয় জীবনদের বাড়িতে। সে এসেছিল জীবনের এক আত্মীয়ার সঙ্গে। উনি জীবনের বাবার মামাতো বোন, তার ফুফু। একই বাড়ি তাদের। জীবনদের ঘরে চার দিন বেড়ালো তারা। চার দিনে তাজ আর জীবনের মধ্যে তেমন একটা কথা হয়নি শুধু তৃতীয় দিনটি ছাড়া। সে সময়টি তাদের বর্ষাকালীন ছুটি চলছিল। সেদিন বিকেলে জীবন শুয়ে শুয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ পড়ছিল। দীপ্তি এসে তাকে দখিনা জানালা দিয়ে ডাকল। সঙ্গে ছিল তাজ। দীপ্তি জীবনদের বাড়িরই। পুকুরের ওপাড়ে তাদের ঘর। এপাড়ে জীবনদের। একই ক্লাসে পড়ে ওরা। ক্লাসে মেয়েদের মধ্যে প্রথম সে। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে দ্বিতীয়। আর জীবন চতুর্থ। ক্লাস রোল অনুযায়ী এ হিসাব হলেও পুথিগত বিদ্যা এবং এর বাইরের জ্ঞান মিলিয়ে হিসাব কষলে প্রথম স্থানটি সবাই জীবনকে ছেড়ে দিতে বাধ্য। দীপ্তি তাকে মাঝে মাঝে বলে ক্লাসের পড়ার বাইরে না গিয়ে ক্লাসে ফার্স্ট হওয়ার চিন্তা মাথায় রাখতে। জীবন বলে, শুধু পাঠ্য বইয়ের জ্ঞান তাদের জন্য যারা দায় মুক্তির জন্য পড়ে। তারা পুকুরেই সাঁতার কাটে। তাই তারা সহজেই তীরের সন্ধান পায়। আমি তাদেরকে অনুসরণ করি যারা সমুদ্রে সাঁতার কাটতে চায়। তারা ক্লান্ত নয়। তীরের সন্ধান এত সহজে পাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে তারা মনে করে না। তারা মনে করে প্রথম হওয়া বড় কথা নয়, কতটুকু অর্জন করা গেল সেটাই বড় কথা।
জীবন ঝটপট বিছানা থেকে উঠলো। চুলগুলো আঁচড়ে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দীপ্তিদের ঘরে গেল। ওদের ঘরে ছিল দীপ্তির মা আর ওরা তিন জন। দীপ্তির মা ব্যস্ত রান্নার কাজে। ঘরের সামনের রুমটি বেশ গোছানো। টিনের বেড়ায় ঘড়ির পেন্ডুলাম দুলছে। বিপরীত দিকের বেড়ায় রয়েছে একটি তৈল চিত্র। বেশ বড় ক্যানভাসে আঁকা। সাদা বা নীল রঙের দেয়াল হলে আরো চমৎকার লাগতো। জীবন আসার সঙ্গে সঙ্গেই দীপ্তি উঠে গেল। একটু পর সে বেতের তৈরী ট্রেতে করে কিছু হালকা খাবার নিয়ে এলো। জীবন আর তাজের হাতে দিয়ে দীপ্তি নিজেও একটি প্লেট নিল। সঙ্গে কথাও হচ্ছে।
: বুঝলে তাসমিনা, তোর সুবাদে আজ এই গৃহে নক্ষত্র নেমে এসেছে। – দীপ্তি বলল।
: কেন, নয় বুঝি জীবন আসে না?
: ওকেই জিজ্ঞেস কর। দুই বছরাধিক কাল পূর্বে একবার এসেছিল। এরপর আজ এলো।
জীবন যেন কিছুই শোনেনি। সে দীপ্তির দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল, রবি ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ পড়েছো?
দীপ্তি কিছু না বলে তাসমিনার মুখের দিকে তাকাল।
: তাজ, তুমি পড়েছো? – জীবন জিজ্ঞেস করলো।
: সুযোগ পাইনি পড়ার।
: ভুল বললে। বল, সুযোগটা করে নেইনি।
দীপ্তি বলল, সে যাক। তোমাকে এখানে কেন ডেকেছি জান?
: না, জানি না।
: তাসমিনার ‘তাজ’ নামটাতো তোমারই দেয়া, তাই না?
: হ্যাঁ।
: তাজ কেন এসেছ এ বাড়িতে জান?
জীবন হাসল। হাসতে হাসতে বলল, কেন বেড়াতেইতো এসেছে, তাই না তাজ?- তাজের চোখে চোখ রেখে বলল।
তাজ কিছুই বলল না। শুধু অপলক চেয়ে রইল জীবনের দিকে। ঠোঁটে হাসি নেই; নেই চোখেও। চোখ দুটি যেন কিছু চাইছে জীবনের কাছে। তাজ বোঝে তার এ ভাষা জগতের আর কেউ না বুঝলেও জীবন যে বুঝে না তা কিন্তু মোটেই নয়। সে তার বুকের ভেতর মন নামক অনাবাদী অথচ উর্বর জমিটা শুধুমাত্র জীবনের জন্য রেখে দিয়েছে। তার প্রতি জীবনের আচরণে সে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে – জীবন কি তাকে সত্যিই ভালবাসে, নাকি বাসে না। জীবনের এ নীরবতা তাকে কষ্ট দেয়।
: জীবন তুমি কি বুঝতে পার তাজ তোমাকে ভালোবাসে?
জীবন মাথা নাড়ায়। হ্যাঁ বোধক জবাব পায় দীপ্তি।
: তাজ আমাকে তার ইচ্ছার কথা বলেছে। সে তোমার হাতে হাত রাখতে চায়- তোমার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চায়।
জীবন কিছুই বলে না। নীরব শ্রোতার ভূমিকা তার। কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর জীবন উঠে দাঁড়ায়। কিছু না বলেই নিঃশব্দে তার প্রস্থান হয় সেখান থেকে।
তাজের চোখ ফেটে অশ্র“ গড়িয়ে পড়ে। ওড়নার আঁচল তুলে নিয়ে সেই অশ্র“কে শোষণ করাচ্ছে। দীপ্তি ওর পাশে গিয়ে বসে। তাজ দীপ্তির কাঁধে তার মাথাটা রাখে। তার কষ্ট দীপ্তির মনে রেখাপাত করে। ওর চোখ দুটিও অশ্র“তে চক চক করে ওঠে। এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত তাজ জীবনের কাছে সেই কথাটি প্রত্যাশা করে। কিন্তু নিষ্ফল হয়।
কিছুদিন পর পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। তাজ ভর্তি হয় গ্রামের একটি কলেজে। আর জীবন ঢাকায়। এরও কিছুদিন পর তাজের বিয়ে ঠিক হয়। পাত্র বিদেশে থাকে। বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর জীবন জানতে পারে। যে দিন সে জানলো সেদিন সে পার্কে গিয়ে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে অশ্র“ বিসর্জন দিয়েছিল। তার এ বিসর্জন দেয়া দেখেনি পৃথিবীর কোন মানব-মানবী। জানবেও না আর কখনো।
আমি’র চলনালাপনীটা বেজে উঠল। মিস কল এসেছে। জীবন ফিরে তাকায়। বলল,
: কখন এলি।
: হলোতো কিছুক্ষণ।
: আমাকে ডাকলি না যে?
: ভাবনায় ছেদ ঘটাতে চাইনি।
এতক্ষণ জীবন আমি’র মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিল। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নিচে নামতে লাগল। সে শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠে বসল। বলল,
: সে কি রে আমি! তুই প্যান্টের ভেতরে পাঞ্জাবী ইন করেছিস!
: আশ্চর্য হচ্ছিস কেন। প্যান্টের ভেতর যদি গেঞ্জি কিংবা শার্ট ইন করে পরা যায়, তাহলে পাঞ্জাবী দোষ করল কি। আমার মন চেয়েছে তাই আমি করেছি। আমাকে দেখতে মন্দ লাগছে?
জীবন এ কথার জবাব দিল না। বরং জিজ্ঞেস করল অন্য কথা।
: চলনালাপনীটা নিয়েছিস কবে? এক সপ্তাহ ধরে উধাও হয়ে কোথায় ছিলি?
: এক পকেট মারের সাথে কাটালাম। বেশ এনজয় করেছি। ওকে নিয়ে চাঁদের আলোয় স্নান করেছি। ও-ই দিয়েছে চলনালাপনীটা।
সেদিন আমি ফার্মগেট থেকে লোকাল বসে উঠেছিল। বাংলামোটর আসার পর তার ব্যাক পকেট থেকে মানি ব্যাগটা পকেটমারের হস্তগত হচ্ছিল। ধরে ফেলেছিল সে। লোকে উত্তম-মধ্যম দিতে চেয়েছিল। আমি তা করতে দেয়নি। তাকে নিয়ে বাস থেকে নেমে গেল। এরপর তাকে নিয়ে যেতে চাইলে লোকটা ভয় পেয়ে গেল। সে তাকে অভয় দিল। বলল, যদি আমার সাথে চল তাহলে উত্তম-মধ্যম থেকে বাঁচবে। অন্যথায়…। লোকটা রাজী হল। এমনটা হওয়ার মত নয়। লোকটা এ পেশায় নতুন। কাঁচা হাত তাই ধরা পড়েছে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার এ পথে আসা। কাজ-কর্ম নেই, তাই এ পথ বেছে নিয়েছিল সে।
সেদিন রাতে আমি লোকটিকে নিয়ে ছাদে জ্যোৎস্নার আলোয় স্নান করেছিল। একেবারে পানিতে স্নানের মতো। আমি’র যুক্তি, শরীরের সবটুকুই জ্যোৎস্নার আলোয় ভেজাতে হবে। তবেই তা হবে জ্যোৎস্নার আলোয় পরিপূর্ণ স্নান।
ছাদে কেউ ছিল না। শুধু ওরা দু’ জন। আমি প্যান্টের বদলে শুধু একটি তোয়ালে পরেছিল। এছাড়া আর কোন বস্ত্র ছিল না তার সর্বাঙ্গে। তপুকেও একটি তোয়ালে দিয়েছিল। তপু পকেটমারটির নাম। সে প্রথমে পরতে চায়নি। লজ্জা করছিল তার। পরে আমি বলল, আমি তাকাব না। দূর থেকে পরে এসো।
তপু তাই করলো। আমি বলল, পানিতে স্নান করতে গেলে শুধু শরীরের নিচের অংশে লজ্জা নিবারণের জন্য থাকবে গামছা বা তোয়লে। কিন্তু চাঁদের আলোয় স্নান করতে গেলে ব্যতিক্রম হবে কেন। তপু, তুমি কি বল?
: বড়ই যুক্তির কথা।
: এমন পরিবেশ চাঁদের আলো তোমার কছে কেমন লাগছে।
: ভালো, খুবই ভালো।
: বুঝলে, চাঁদের আলোর সাথে মানুষের সম্পর্ক যতো নিবিড় হয়, ততোই মানুষের মনটা আলোকিত হয়, চাঁদের মতো আলোকিত।
: তাই বুঝি আমারে চাঁদের আলোয় নিয়ে আসছেন?
: তোমার মাথাটাতো বেশ ভালো। কিন্তু আমার হাতে ধরা পড়লে কেন?
: হয়তো এমন একটা পরিবেশে চাঁদের আলো দেখার জন্য। ভাইজান, আপনার পায়ে ধরি আপনি আমারে একটা কাজ জোগাড় কইরা দেন। আমি আর এই কাজ করুম না। বলতে বলতে তপু আমি’র পা ধরতে হাত বাড়ালো।
আমি তপুকে তা করতে দেয়নি। বলল, ঠিক আছে তাই হবে। তবে এক শর্তে।
: এক শর্ত কেন, দশ শর্ত হইলেও আপত্তি নাই।
: শর্তটা হলো তুমি এই এক সপ্তাহ আমার সাথে ঘুরবে।
এইডা আবার কোন শর্ত হইল নাকি।
সপ্তাহের শেষ দিন আমি তপুকে একটি কাজের ব্যবস্থা করে দিল। তপু চলনালাপনীটা আমিকে দিতে চাইল। কিন্তু আমি তা নিতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত তার অনুরোধে এক মাসের জন্য রাখল। রাখার পেছনে মূল কারণটি হলো সেটিতে অনেকগুলো ফিচার রয়েছে। অনেক দামী সেট বলে কথা। মাস খানেকের মধ্যে আবার আমি তপুকে তা ফিরিয়ে দিবে।
জীবন আমি’র প্যান্টের ভেতর হতে পাঞ্জাবীর ইন্টা খোলালো। এরপর ওকে বসতে বলল। আমি বলল-
: এখন বসবো না। আড্ডা দেয়ার জন্য একটা দোকান ঘর ভাড়া করেছি। তোকে সংবাদটা দিতে এলাম।
আড্ডা দেয়ার জন্য দোকান ঘর ভাড়া নেয়ার কথা শুনে অনেকে বিস্মিত হলেও আমি’র বন্ধুরা কেউ বিস্মিত হয়নি। আমি’র কাজগুলো এমনই অদ্ভুদ।
: আড্ডা দেয়ার জন্য কোন পাগলে তোকে দোকান ভাড়া দিলো?
: উনি পাগল না, সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ। সরকারী চাকুরী করেন। এ্যাডভান্সটাও করে এসেছি। ভাড়া নিয়েছি মাত্র তিন মাসের জন্য। উনি বললেন, উনার ভাড়াটা পেলেই হল।
: বেশ ভালো।
: তুই মনে হয় খুশি হলি না।
: নিয়ে যখন ফেলেছিস খুশি আর অখুশির কি আছে।
: তুই আসবিতো?
: চেষ্টা করবো।
: সন্ধ্যার পর এলে আমাদের পাবি না। তার আগেই আমরা বন্ধ করে ফেলবো। কারণ আড্ডা দেয়ার জন্য দোকান ভাড়া নিয়েছি। অন্যের সমালোচনামূলক কাজের দায়ভার নিজের কাঁধে নেয়ার জন্য নেইনি। এরপর আমি তার চালনালাপনীতে একটা নাম্বার টিপতে বেরিয়ে পড়ল। জীবন জানালার সামনে এসে বাইরে তাকালো। আকাশে ছেঁড়া-খোঁড়া মেঘের আনাগোনা। হালকা বাতাসও বইছে। আজ চৈত্রের শেষ দিন। এ বৈশাখের আগমনী বার্তা। জীবন আনমনা হয়ে চেয়ে থাকে আকাশের পানে।

(চলবে)

বইটি সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন: এক জীবনের গল্প

সর্বমোট পঠিত: 468

সর্বশেষ সম্পাদনা: জানুয়ারি ২৩, ২০২১ at ৭:১২ পূর্বাহ্ণ

প্রিজম আইটি: ওয়েবসাইট ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট-এর জন্য যোগাযোগ করুন- ০১৬৭৩৬৩৬৭৫৭